লেখায় ও রেখায় জাতীয়তাবোধের বিকাশ সম্পর্কে সংক্ষেপে লেখো ।

আমার প্রিয় শিক্ষার্থী বন্ধুরা আজকের এই আর্টিকেলে আমাদের আলোচ্য বিষয় ‘লেখায় ও রেখায় জাতীয়তাবোধের বিকাশ সম্পর্কে সংক্ষেপে লেখো ।’

অথবা বঙ্কিমচন্দ্রের ‘আনন্দমঠ’ জাতীয়তাবাদী ভাবনায় কি প্রভাব রেখেছিল ?

অথবা বিবেকানন্দ ও তাঁর ‘বর্তমান ভারত’ জাতীয়তাবাদে কি প্রভাব ফেলেছিল ?

অথবা ভারতের জাতীয়তাবোধের বিকাশে গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুরের ব্যঙ্গচিত্র কতখানি প্রভাব ফেলেছিল ?

অথবা অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘ভারতমাতা চিত্র’ জাতীয়তাবোধে কি কোন প্রভাব রেখেছিল ?

অথবা ভারতীয় জাতীয়তাবোধের বিকাশে লেখা ও রেখা কিভাবে ফুটে উঠেছিল ?

অথবা লেখায় ও রেখায় কিভাবে জাতীয় চেতনার প্রসার ঘটে তা আলোচনা করো ।

অথবা ভারতীয় জাতীয়তাবোধের বিকাশ লেখা ও রেখায় কিভাবে ফুটে উঠেছিল ?

অথবা লেখায় ও রেখায় জাতীয়তাবাদের বিকাশ আলোচনা করো ।

অথবা  লেখায় ও রেখায় জাতীয়তাবাদ বিকাশের পরিচয় দাও ।

অথবা লেখায় ও রেখায় জাতীয়তাবাদ [ আনন্দমঠ , বর্তমান ভারত , গোরা , ভারতমাতা ]

অথবা লেখায় ও রেখায় জাতীয়তাবাদের বিকাশ সম্পর্কে আলোচনা করো| উনবিংশ শতকে বিভিন্ন সাহিত্য ও অঙ্কিত চিত্র কিভাবে জাতীয়তাবাদের বিকাশ ঘটিয়েছিল ?

ভূমিকা :

লেখার সঙ্গে সঙ্গে রেখা বা তুলির টান‌ও যে জাতীয়তাবোধের বিকাশ ঘটাতে পারে তার‌ই জ্বলন্ত নিদর্শন উনিশ শতকের শিক্ষিত মধ্যবিত্ত সম্প্রদায় । আর এনাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন _____

ক) বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় _____’আনন্দমঠ’ (লেখায়)

খ) বিবেকানন্দ _____’বর্তমান ভারত’ (লেখায়)

গ) গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুর _____’ব্যঙ্গচিত্র’ (রেখায়)

ঘ) রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর _____’গোড়া’ (লেখায়)

ঙ) অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর _____’বঙ্গমাতা চিত্র’ (রেখায়)

(ক) বঙ্কিমচন্দ্রের জাতীয়তাবাদী ভাবনা ও আনন্দমঠ :

ভূমিকা :

উনবিংশ শতাব্দীতে ভারতের জাতীয়তাবাদের বিকাশে যেসব সাহিত্যিক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিল তাদের মধ্যে সর্বাধিক উল্লেখযোগ্য ছিলেন বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় । তাঁর রচিত ‘আনন্দমঠ’ উপন্যাসটি জাতীয়তাবাদী চেতনা বিকাশে বিশেষ সহায়তা করেছিল । দেশাত্মবোধ জাগরণে এই গ্রন্থের অবদানের জন্য এটি ‘স্বদেশপ্রেমের গীতা’ নামে পরিচিত ।

আনন্দমঠ :

‘আনন্দমঠ’  উপন্যাসটি রচিত হয়েছিল অষ্টাদশ শতকের শেষ দিকে বাংলার এক সংকটময় সময়ে । এই উপন্যাসটির পটভূমি হল ছিয়াত্তরের মন্বন্তর ও সন্ন্যাসী বিদ্রোহের সূচনা ।

ব্রিটিশ শাসনের দুর্দশার চিত্র :

বঙ্কিমচন্দ্র তাঁর এই উপন্যাসে ভারতবাসীর সামনে পরাধীন ভারত মাতার দুর্দশার করুণচিত্র তুলে ধরেছেন এবং স্বৈরাচারীর ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে ভারতবাসীকে বিদ্রোহের আহ্বান জানিয়েছেন ।

‘বন্দেমাতরম’ সংগীত :

তাঁর লেখা ‘বন্দেমাতরম’  সংগীতটি দেবী দুর্গার বন্দনা গীত হিসেবে ‘আনন্দমঠ’ উপন্যাসে ব্যবহার করেন । সংগীতটি ক্রমে দেশপ্রেমিকদের ‘জাতীয় সংগীত’ ও  অগ্নিমন্ত্রে পরিণত হয় । বিপ্লবীরা বন্দেমাতরম ধ্বনি তুলে ফাঁসির দড়ি গলায় পড়েন । ভিকাজী কামা কর্তৃক রূপায়িত জাতীয় পতাকায় ‘বন্দেমাতরম’  ধ্বনিটি স্থান পায় ।

সন্তান দল :

বঙ্কিমচন্দ্র তাঁর ‘আনন্দমঠ’ উপন্যাসে সন্তান দলকে দেশমাতার সেবায় নিবেদিত প্রাণ হিসেবে তুলে ধরেছেন । যুদ্ধক্ষেত্রে ইংরেজ সেনা কামান দাগলেও তারই মধ্যে সন্তান দল দেশমাতার মুক্তির জন্য ‘বন্দেমাতরম ধ্বনি’  দিয়ে এগিয়ে চলেছে । দেশমাতার জন্য সন্তান দলের এরূপ আত্মত্যাগের নজির দেশবাসীর মনে গভীর জাতীয়তাবোধ জাগ্রত করে ।

উপসংহার :

বঙ্কিমচন্দ্রের লেখা ‘আনন্দমঠ’ উপন্যাসটি শুধুমাত্র জাতীয়তাবাদের বিকাশের ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ ছিল না , বিপ্লবী সংগঠনগুলির কার্য পরিচালনার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছিল । এমনকি নারীর সমাজও তাঁর লেখনীর দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়েছিল ।

(খ) বিবেকানন্দের জাতীয়তাবাদী ভাবনা ও বর্তমান ভারত :

ভূমিকা :

স্বামী বিবেকানন্দ ঔপনিবেশিক আমলে ভারতীয়দের জাতীয়তাবোধের বিকাশের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিলেন । তার রচিত ‘বর্তমান ভারত’ গ্রন্থটির মাধ্যমে তিনি ভারতে জাতীয়তাবোধের বিকাশ ঘটিয়েছিলেন । এজন্য বিপ্লবী অরবিন্দ ঘোষ বলেছেন , ‘বিবেকানন্দই আমাদের জাতীয় জীবনের গঠন কর্তা’ ।

গৌরবোজ্জ্বল অতীত :

স্বামী বিবেকানন্দ তাঁর ‘বর্তমান ভারত’  গ্রন্থে বৈদিক যুগ থেকে ব্রিটিশ শাসনকাল পর্যন্ত ভারতের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস বর্ণনা ও ব্যাখ্যা করেছেন ।

জাতীয়তাবাদের বীজমন্ত্র :

‘বর্তমান ভারত’ গ্রন্থে বিবেকানন্দ দেখালেন যে ব্রাহ্মণ্যতত্ত্বের প্রাধান্য বৈদিক যুগ থেকে বৌদ্ধ যুগে অনেকটা হ্রাস পায় , সেখানে নতুন রাজশক্তির আবির্ভাব হয় । বিবেকানন্দ ব্যাখ্যা করে দেখালেন যে প্রকৃত জাতীয়তাবোধের প্রধান অবলম্বন হলো জাতীয় ঐতিহ্য ।  তিনি মনে করেন , মানুষের ‘গণজাগরণ’ তখনই সম্ভব হয়ে উঠবে যখন এদেশের শূদ্ররা সমান অধিকার পাবে ।

ঐক্য :

বিবেকানন্দ উপলব্ধি করেছিলেন যে , পরাধীন ভারতের মুক্তির জন্য প্রয়োজন ভারতীয়দের ঐক্য । তিনি ভারতীয় সমাজের বর্ণবৈষম্য এবং শূদ্রদের প্রতি ঘৃণা ও বঞ্চনাকে পরিত্যাগ করে সকলের মধ্যে ঐক্য গড়ে তোলার কথা বলেছেন ।

স্বদেশপ্রেমের মন্ত্র :

স্বামী বিবেকানন্দ ভারতবাসীকে স্বদেশ প্রেমের মন্ত্রে উদ্বুদ্ধ করেছেন এই বলে , ‘হে বীর সাহস অবলম্বন করো , সদর্পে বল – আমি ভারতবাসী , ভারতবাসী আমার ভাই , বল মূর্খ ভারতবাসী , দরিদ্র ভারতবাসী , ব্রাহ্মণ ভারতবাসী , চন্ডাল ভারতবাসী  আমার ভাই …..!’

দেশমাতার মুক্তি :

বিবেকানন্দ ‘বর্তমান ভারত’ গ্রন্থে বলেছেন যে , “মানুষ জন্ম থেকে মায়ের জন্য বলি প্রদত্ত” ।  পাশ্চাত্যের অন্ধ অনুকরণ ছেড়ে তিনি ভারত মাতার মুক্তির জন্য দেশবাসীকে ঝাঁপিয়ে পড়তে আহ্বান জানান ।

উপসংহার :

স্বামী বিবেকানন্দের কাছে ভারতবর্ষ ছিল সকল ভারতীয়র ভারতবর্ষ । অর্থাৎ এখানে ধনী , দরিদ্র , হিন্দু মুসলিমদের মধ্যে কোন ভেদাভেদ নেই , সকলেই এক জাতি ।

(গ) ভারতের জাতীয়তাবোধের বিকাশে গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুরের ব্যঙ্গচিত্র : 

ভূমিকা :

ভারতে জাতীয়তাবোধের বিকাশে নানা উপাদান নানাভাবে সহায়তা করেছে । লেখায় ও রেখায় ভারতীয় জাতীয়তাবাদের বিকাশ হয়েছিল । এর মধ্যে রেখার আঙিনায় গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুরের ব্যঙ্গচিত্রের উজ্জ্বল উপস্থিতি আমাদের চোখে পড়ে । সেগুলি হল –

সামাজিক চিত্র :

গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুর ব্যঙ্গচিত্রের মধ্য দিয়ে সমাজে ধনী ও অভিজাতদের চালচলন , হাবভাব , মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তদের সঙ্গে দূরত্ব প্রভৃতি যা দেখেছেন তারই সমালোচনা তুলির টানে তুলে ধরেছেন ।

বাবু সমাজের চিত্র :

বাঙালি বাবু সমাজ ‘সাহেব’  হওয়ার চেষ্টায় নিজেকে নিয়োজিত করেছে তারই ব্যঙ্গচিত্র গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুরের অঙ্কিত চিত্রে ফুটে উঠেছে ।

খল ব্রাহ্মণ :

‘খল ব্রাহ্মণ’  ব্যঙ্গচিত্রটিতে  দেখা যায় যে , ধর্মের প্রতি অনুরাগ না দেখিয়ে একজন ব্রাহ্মণ মদ , মাংস ও নিম্ন রুচিতে প্রবৃত্ত হয়েছে । এই নিম্ন রুচি সম্পন্ন সমাজ গগনেন্দ্রনাথের চিত্রের মধ্য দিয়ে সমালোচিত হয় ।

অন্যান্য ব্যঙ্গচিত্র :

তাঁর আঁকা ব্যঙ্গচিত্র গুলির বেশিরভাগই ‘বিরূপ বস্ত্র’  ও ‘অদ্ভুত লোক’  এবং ‘নয়া হুল্লোড়’ নামক গ্রন্থে তিনটি খণ্ডে প্রকাশিত হয়েছে । এগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য ব্যঙ্গচিত্র গুলি হল ‘প্রচন্ড-সমতা’ জাঁতাসুর প্রভৃতি ।

উপসংহার :

গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর ব্যঙ্গচিত্রের মধ্য দিয়ে ঔপনিবেশিক সমাজের নানা দিকের যে সমালোচনা করেছেন তা জনমনকে আলোড়িত করেছে এবং জাতীয়তাবোধের বিকাশে যথেষ্ট সহায়ক হয়েছে ।

(ঘ) রবীন্দ্রনাথের গোরা :

এই উপন্যাসে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যে সমস্ত জাতীয়তাবাদী ভাবধারা চিত্রিত করেছেন সেগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য গুলি ছিল –

(ক) ব্রিটিশ বিরোধিতা ও স্বদেশপ্রেমের মন্ত্র প্রচার ।

(খ) পাশ্চাত্য সভ্যতার বিরোধিতা ।

(গ) গোরা চরিত্রের মধ্য দিয়ে জাতিভেদের নিরসনের চেষ্টা ।

(ঘ) জাতীয়তাবোধের মূল উপলব্ধি প্রভৃতি ।

উপসংহার :

আসলে লেখা ও রেখায় জাতীয়তাবোধের বিকাশে এমনই গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলেছিল যা ভারতীয় জনমানসে খুব কম সময়ে বিদ্যুৎ প্রভাব ফেলেছিল ।

জানুন লেখায় ও রেখায় কিভাবে জাতীয়তাবোধের বিকাশ ঘটেছে। সংক্ষিপ্ত ও পরীক্ষার উপযোগী বাংলা আলোচনা।

Leave a Comment