সংক্ষেপে মহাবিদ্রোহের (১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দের) চরিত্র বিশ্লেষণ করো ।

প্রিয় পাঠক পাঠিকা আজকের এই আর্টিকেলে আমাদের আলোচ্য বিষয় “সংক্ষেপে মহাবিদ্রোহের (১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দের) চরিত্র বিশ্লেষণ করো ।”

অনুরুপ প্রশ্ন _____ মহাবিদ্রোহের প্রকৃতি ও চরিত্র বিশ্লেষণ করো ।

অনুরুপ প্রশ্ন _____ মহাবিদ্রোহের চরিত্র বিশ্লেষণ করো ।

অনুরুপ প্রশ্ন _____ সিপাহী বিদ্রোহের চরিত্র আলোচনা করো ।

ভূমিকা :

১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দে ভারতবর্ষের বুকে ঘটে যাওয়া বহুচর্চিত বিদ্রোহটির প্রকৃতি বা চরিত্র নির্ধারণে এর সার্ধ শত – শত বৎসর অতিক্রান্তেও কোন সুস্পষ্ট সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া সম্ভব হয়নি । স্বভাবতই তাত্ত্বিক , ঐতিহাসিক মহলে উঠে এসেছে নানা পরস্পর – বিরোধী ব্যাখ্যা ।

(i) সিপাহী বিদ্রোহ :

প্রবক্তা :

চার্লস রেকস , স্যার জন লরেগ , দাদাভাই নৌরজি , দুর্গাদাস ব্যানার্জি প্রমুখ ব্যক্তিবর্গ ।

মূল বক্তব্য :

এই তত্ত্বের প্রবক্তাদের মতে , ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দের বিদ্রোহ মুখ্যত ছিল একটি ‘সিপাহী বিদ্রোহ’ । সিপাহীদের অসন্তোষ থেকেই বিদ্রোহের সূচনা ও প্রসার । অসামরিক লোকেদের অংশগ্রহণ ছিল নগণ্য এবং মুষ্টিমেয় কিছু ব্যক্তি আইন – শৃংখলার অবনতির সুযোগ নিয়েছিলেন মাত্র । কোনো বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থের লক্ষ্যে আন্দোলন পরিচালিত হয়নি ,  অঞ্চল ভেদে বিদ্রোহের নেতাদের চাওয়া পাওয়া ছিল ভিন্ন । সিপাহীদের সঙ্গেও বিদ্রোহের প্রধান নেতাদের কোনো যোগাযোগ ছিল না । ভারত থেকে ইংরেজ শাসন উৎখাতের লক্ষ্যে কোনো কেন্দ্রীয় সংগঠন গড়ে তোলা হয়নি । দেশীয় রাজাদের অনেকেই , এমনকি শিক্ষিত মধ্যবিত্ত বাঙালি সমাজ‌ও আন্দোলন থেকে দূরে ছিল । আবার শিখ , গোর্খা প্রভৃতি যোদ্ধা জাতি ভারতে পুনরায় ‘মুঘল শাসনের দুর্দিন’ ফিরে আসার আশঙ্কায় সরাসরি বিদ্রোহ দমনে সরকারকে সাহায্য করেছিল । সুতরাং , উপযুক্ত যুক্তির আলোকে এই শ্রেণীর তাত্ত্বিকগণ ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দের বিদ্রোহকে ‘সিপাহী বিদ্রোহ’ অপেক্ষা অধিক কিছু আখ্যা দিতে নারাজ ।

(ii) জাতীয় বিদ্রোহ :

প্রবক্তা :

কাল মার্কস , নর্টন , ডাফ প্রমুখ ব্যক্তিবর্গ ।

মূল বক্তব্য :

এঁদের বক্তব্যর নির্যাস হল – সিপাহীদের দ্বারা বিদ্রোহের সূচনা হলেও অচিরেই এর বিপুল সম্ভার ,  জনগণের বিপুল সমর্থন ও অংশগ্রহণ , হিন্দু – মুসলিম ঐক্য , বিদ্রোহ দমনে সরকারের ব্যাপক যুদ্ধ পরিচালনা প্রভৃতি এই বিদ্রোহকে গণ সংগ্রামের চরিত্র দান করেছে । তাঁরা দেখিয়েছেন ,  দেশের উত্তর , মধ্য ও উত্তর-পশ্চিম অংশে বিশেষত অযোধ্যা , দিল্লি , রোহিল খন্ড প্রভৃতি অঞ্চলে এই বিদ্রোহ কার্যত গণ সংগ্রামের রূপ নেয় । মার্কসের পরিভাষায় – (জন বুল) যাকে সেনা বিদ্রোহ মনে করেছেন , সেটা আসলে জাতীয় বিদ্রোহ ।”

(iii) স্বাধীনতার প্রথম সংগ্রাম :

প্রবক্তা :

প্রখ্যাত স্বাধীনতা সংগ্রামী বিনায়ক দামোদর সাভারকার তাঁর ‘ইন্ডিয়ান ওয়্যার অফ ইন্ডিপেন্ডেন্স’  গ্রন্থে এই তত্ত্বের অবতারণা করেছেন ।

মূল বক্তব্য :

১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দের বিদ্রোহকে তিনি দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ‘স্বাধীনতার প্রথম সংগ্রাম’  বলে অভিহিত করেছেন । তাঁর মতে ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দের বিদ্রোহেই প্রথম জাতি-ধর্ম-বর্ণ-পেশা-শ্রেণী নির্বিশেষে আপামর ভারতবাসী একই ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে , এক‌ই শত্রুর মোকাবিলায় শামিল হয়েছিল । ভারত থেকে অত্যাচারী ইংরেজ শাসনের উৎপাটন ছিল তাদের সাধারণ লক্ষ্য ।

(iv) সামন্ত বিদ্রোহ :

মূল বক্তব্য :

ডক্টর রজনী পাম দত্ত , আর. সি. মজুমদার প্রমুখ মার্কসবাদী ঐতিহাসিকগণ ।

মূল বক্তব্য :

এঁদের মতে গদিচ্যুত ও রাজ্যচ্যুত সামন্তরাজারা যথা (নানা সাহেব , তাঁতিয়া টোপি , লক্ষীবাঈ প্রমুখ ) নিজেদের স্বার্থ সুরক্ষিত রাখতে নিজেদের অঞ্চলে জনগণকে ক্ষেপিয়ে তুলে বিদ্রোহে শামিল হয়েছিলেন । ডঃ মজুমদার এই বিদ্রোহকে ‘ক্ষয়িষ্ণু অভিজাত তন্ত্র ও মৃতপ্রায় সামন্ত  শ্রেণীর মৃত্যুকালীন আর্তনাদ’ বলে আখ্যায়িত করেছেন । তিনি আরো লিখেছেন _____”The First National War of Independence’ is neither ‘first’nor ‘national’ not ‘ the war of independence.”

মন্তব্য :

বস্তুতপক্ষে ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দের বিদ্রোহ কোনো ঐতিহাসিকের নির্দিষ্ট তাত্ত্বিক বক্তব্য মেনে পরিচালিত হয়নি । গতির আবেগে বিদ্রোহ সমস্ত তত্ত্বকেই সংমিশ্রিত করেছিল । তাই ঐতিহাসিক C.A Bayly -কে উদ্ধৃত করেই আলোচনার ইতি টানা যায় – “The Indian Rebellion of 1857 was not one movement……….it was many.”

প্রিয় পাঠক-পাঠিকা,
এই আলোচনার মাধ্যমে যদি আপনি কিছু জ্ঞান, অনুপ্রেরণা বা চিন্তার খোরাক পেয়ে থাকেন — তবেই আমাদের এই প্রচেষ্টা সার্থক। আপনাদের মতামত, প্রশ্ন, ও পরামর্শ আমাদের পথচলায় দিশা দেখায়।

আমরা চেষ্টা করেছি সহজ ভাষায় বিষয়টি তুলে ধরতে, যাতে সকল স্তরের পাঠকের কাছে বোধগম্য হয়। ভবিষ্যতে এমন আরও বিষয় নিয়ে ফিরে আসার প্রতিশ্রুতি রইল।

পাশেই থাকুন, শেয়ার করুন, এবং আমাদের লেখা পড়ে মতামত জানাতে ভুলবেন না।
আপনার একটি কমেন্ট আমাদের আগামী লেখার অনুপ্রেরণা হতে পারে।

ধন্যবাদ ও শুভেচ্ছা 🌼


Leave a Comment