প্রিয় শিক্ষার্থীবৃন্দ আজকের এই আর্টিকেলে আমাদের আলোচ্য বিষয় “শিক্ষাবিস্তারে প্রাচ্যবাদী ও পাশ্চাত্যবাদী বিতর্ক কী? উচ্চশিক্ষার বিকাশে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকা আলোচনা করো।”
||প্রথম অংশ||
ভূমিকা :
ঔপনিবেশিক ভারতে পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রসারের ইতিহাস পর্যালোচনায় যে বিতর্কটি প্রাসঙ্গিকভাবেই উঠে আসে , তা হল – প্রাচ্যবাদী ও প্রাশ্চাত্যবাদী বিতর্ক ।
প্রাচ্যবাদী ও পাশ্চাত্যবাদী বিতর্ক
বিতর্কের সূচনা :
১৮১৩ খ্রিস্টাব্দের সনদ আইনের ২৯ নম্বর ধারায় বলা হয় যে , ভারতীয়দের শিক্ষার জন্য কোম্পানি এখন থেকে বছরে অন্তত এক লক্ষ টাকা ব্যয় করবে । কিন্তু সনদ আইনি উল্লেখিত এই এক লক্ষ টাকা প্রাচ্য না পাশ্চাত্য – কোন শিক্ষা খাতে ব্যয়িত হবে , তার স্পষ্ট নির্দেশিকা না থাকায় অচিরেই নতুন করে বিতর্কের সৃষ্টি হয় । ইতিহাসে এই বিতর্ক প্রাচ্যবাদী ও পাশ্চাত্যবাদী বিতর্ক নামে পরিচিত ।
প্রাচ্যবাদীগণ :
প্রাচ্যবাদীদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন উইলিয়াম কোলব্রুক , উইলসন , প্রিন্সেপ প্রমুখ ব্যক্তিবর্গ ।
মূল বক্তব্য :
এঁদের বক্তব্যর মূল নির্যাস হল , ভারতে ইংরেজি ভাষা ও ইংরেজির শিক্ষার প্রবর্তন করলে তা আপামর ভারতবাসীর হৃদয়ে ক্ষোভের সঞ্চার করবে এবং তা ভারতে ব্রিটিশ শাসনের ভিত্তিকে দুর্বল করে দেবে ।
পাশ্চাত্যবাদীগণ :
পাশ্চাত্যবাদীদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন আলেকজান্ডার ডাফ , মেকলে , স্যান্ডার্স , রামমোহন রায় প্রমুখ ব্যক্তিবর্গ ।
মূল বক্তব্য :
এঁদের বক্তব্যের মূল নির্যাস হল একমাত্র পাশ্চাত্য তথা ইংরেজি শিক্ষা বিস্তৃত হলেই ভারতীয়দের পচনশীল সমাজব্যবস্থা এবং ধর্ম ও চরিত্রের অধঃপতিত নৈতিকতার উন্নতি ঘটবে ।
মেকলে মিনিটস :
লর্ড বেন্টিঙ্ক এর আইন সচিব ও খ্যাতনামা পণ্ডিত টমাস ব্যাবিংটন মেকলে ‘কমিটি অফ পাবলিক ইন্সট্রাকশন’ – এর সভাপতি নিযুক্ত হয়ে ১৮৩৫ খ্রিস্টাব্দে তাঁর বিখ্যাত ‘মিনিটস’ বা প্রতিবেদনে ভারতে পাশ্চাত্য শিক্ষা প্রসারের উপর গুরুত্ব আরোপ করেন এবং বলেন যে , উচ্চ ও মধ্যবিত্তের মধ্যে ইংরেজি শিক্ষা বিস্তৃত হলে ‘ফিলস্ট্রেশন থিওরি’ অনুযায়ী তা ধীরে ধীরে সাধারণ মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়বে । এটি ‘মেকলে মিনিটস’ নামে পরিচিত ।
বিতর্কের অবসান :
মেকলের অসাধারণ বাগ্মীতা ও যুক্তির কাছে প্রাচ্যবাদীরা পরাজিত হন । ১৮৩৫ খ্রিস্টাব্দে বড়লাট লর্ড বেন্টিঙ্ক ইংরেজি শিক্ষাকে সরকারি নীতি হিসেবে ঘোষণা করলে দীর্ঘ দুই দশক ধরে চলতে থাকা প্রাচ্যবাদী ও পাশ্চাত্যবাদী বিতর্কের অবসান ঘটে ।
প্রাচ্যবাদী ও পাশ্চাত্যবাদী বিতর্কে পাশ্চাত্যবাদীদের জয় লাভের ফলে ভারতে ইংরেজির মাধ্যমে পাশ্চাত্যশিক্ষার দরজা খুলে যায় । ভারতীয়দের বিশুদ্ধ জ্ঞান – পিপাসা বঙ্গীয় নবজাগরণের ক্ষেত্র প্রস্তুত করে ।
||দ্বিতীয় অংশ||
উচ্চশিক্ষার বিকাশে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকা
ভূমিকা :
ভারতে পাশ্চাত্য ধাঁচে আধুনিক উচ্চতর শিক্ষা প্রসারের উদ্দেশ্যে স্যার চার্লস উডের নির্দেশনামার ভিত্তিতে বড়লাট লর্ড ক্যানিং- এর শাসনকালে ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দের ২৪ শে জানুয়ারি প্রতিষ্ঠিত হয় কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় । প্রতিষ্ঠা লগ্ন থেকে শুরু করে আজও এই প্রতিষ্ঠান উচ্চশিক্ষার প্রসারে তার সদর্থক ভূমিকা পালন করে চলেছে ।
উদ্দেশ্য :
সূচনা লগ্নে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্দেশ্য ছিল অধীনস্থ ও অনুমোদিত স্কুল কলেজগুলির পরীক্ষা গ্রহণ এবং ডিগ্রী প্রদান যদিও পরবর্তীতে এই বিশ্ববিদ্যালয় নিজেই একটি পূর্ণাঙ্গ শিক্ষণ ধর্মী প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়।
পরিসর :
সূচনা লগ্নে সমগ্র উত্তর , পূর্ব ও মধ্য ভারত , এমনকি বর্তমান মায়ানমার এবং শ্রীলঙ্কার এক বিস্তীর্ণ অঞ্চলের কলেজগুলির শিক্ষা এই বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে পরিচালিত হতো ।
পরীক্ষা গ্রহণ :
বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচালনায় প্রথম বি.এ পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয় ১৮৫৮ খ্রিস্টাব্দে । মোট ১১ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ও যদুনাথ বসু স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন । এর ২৬ বছর পর ১৮৮৩ খ্রিস্টাব্দে মহিলাদের মধ্যে প্রথম কাদম্বিনী গাঙ্গুলী ও চন্দ্রমুখী বসু স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন । এইভাবে বিশ্ববিদ্যালয় ক্রমে ক্রমে গণশিক্ষার দ্বার খুলে দিতে থাকে ।
স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের অবদান
১৯০৬ খ্রিস্টাব্দে স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায় এই বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য পদে যোগদান করেন । তাঁর কার্যকাল যথার্থই বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের স্বর্ণযুগ । এই সময় দ্বারভাঙ্গা হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রন্থাগার স্থাপিত হয় । ১৯০৮ খ্রিস্টাব্দে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাপাখানা , ১৯০৯ খ্রিস্টাব্দে বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন কলেজ এবং ১৯১৪ খ্রিস্টাব্দে বিজ্ঞান কলেজ স্থাপিত হয় । স্যার আশুতোষের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় দেশ-বিদেশের বহু স্বনামধন্য পন্ডিত কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক পদে যোগদান করেন এবং এইভাবে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় যথার্থ অর্থেই এক আন্তর্জাতিক রূপ পায় ।
মূল্যায়ন :
বাস্তবিকই কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় বর্তমানে একটি ‘সেন্টার অফ এক্সিলেন্স’ এ পরিণত হয়েছে । অন্তত পাঁচ জন নোবেল জয়ী ব্যক্তিত্ব যথাক্রমে রোনাল্ড রস , রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর , সি.ভি রমন , অমর্ত্য সেন এবং অভিজিৎ বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায় কোনো না কোনো সময় এই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে যুক্ত থেকে এর গৌরব বৃদ্ধি করেছেন ।
আর এই পথচলায় কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় হয়ে ওঠে ভারতীয় উচ্চশিক্ষার মাইলস্টোন।”
প্রিয় পাঠক-পাঠিকা,
এই আলোচনার মাধ্যমে যদি আপনি কিছু জ্ঞান, অনুপ্রেরণা বা চিন্তার খোরাক পেয়ে থাকেন — তবেই আমাদের এই প্রচেষ্টা সার্থক। আপনাদের মতামত, প্রশ্ন, ও পরামর্শ আমাদের পথচলায় দিশা দেখায়।
আমরা চেষ্টা করেছি সহজ ভাষায় বিষয়টি তুলে ধরতে, যাতে সকল স্তরের পাঠকের কাছে বোধগম্য হয়। ভবিষ্যতে এমন আরও বিষয় নিয়ে ফিরে আসার প্রতিশ্রুতি রইল।
পাশেই থাকুন, শেয়ার করুন, এবং আমাদের লেখা পড়ে মতামত জানাতে ভুলবেন না।
আপনার একটি কমেন্ট আমাদের আগামী লেখার অনুপ্রেরণা হতে পারে।
ধন্যবাদ ও শুভেচ্ছা 🌼
—